GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / প্রথম পাতা / জুলাই জাদুঘরের ভাবনা ও পরিকল্পনা, যা জানালেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

জুলাই জাদুঘরের ভাবনা ও পরিকল্পনা, যা জানালেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

জুলাই জাদুঘরের ভাবনা ও পরিকল্পনা, যা জানালেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

জুলাই জাদুঘর কী ভাবনা থেকে তৈরি হলো, এর নেপথ্যে কারা কাজ করেছেন এবং জাদুঘরকে কীভাবে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও আবেগঘন যাত্রার অংশ হিসেবে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা তুলে ধরেছেন সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি জুলাই জাদুঘরের আর্টিস্টিক ডিরেক্টরের দায়িত্বও পালন করেছেন।

ফারুকীর ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই জাদুঘরের কাজ শুরুর সময় তাদের সামনে নির্দিষ্ট কোনো রেফারেন্স বা পরিষ্কার পরিকল্পনা ছিল না। জাতীয় জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠান পর্যালোচনা করলেও তিনি মনে করেছিলেন, শুধু প্রদর্শনযোগ্য সামগ্রী দিয়ে এমন একটি জাদুঘর তৈরি করা উচিত নয়, যা দর্শককে একটি আবেগঘন যাত্রার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবে না।

তিনি জানান, শুরুতে জাদুঘরের জায়গাটিতে তেমন কিছুই ছিল না। গাছতলায় টেবিল বসিয়ে কয়েকজন মিলে অফিসের কাজ শুরু করেছিলেন। পরে তানজিম ওয়াহাবকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই জাদুঘরের ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গড়ে ওঠে গবেষণা দল

তানজিম ওয়াহাবকে যুক্ত করার পর একটি কোর রিসার্চ টিম গঠন করা হয়। এতে কবি হাসান রোবায়েত, সহুল আহমেদ মুন্না, খন্দকার রাকিব, এহসান মাহমুদ, মশফিকুর রহমান জোহান ও সাঈদ খান সাগরসহ অনেকে যুক্ত ছিলেন।

এ ছাড়া ফটোগ্রাফার ও কিউরেটর শামসুল আলম, হাদী উদ্দিন ও সহন এবং পরে গবেষক হিসেবে কবি রুম্মানা জান্নাত, ফান্তাসির মাহমুদ, মালিহা নামলাহ ও হাসান ইনাম যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে জুবায়ের ইবনে কামাল, আবু বকর সাঈম ও সাবিহা নাহলাও দলে যোগ দেন।

হাসান ইনাম ও আবু বকর সাঈম জুলাই শহীদদের স্মারক সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ করেন। এ কাজে পরে শহীদ সৈকতের বোন সেবন্তীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জুলাই আন্দোলনের বেশির ভাগ আর্কাইভাল ফুটেজ সরবরাহ করে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স।

গ্রাফিক ডিজাইনের কাজেও একটি দল যুক্ত ছিল। আল হেলাল সম্রাট, তানভীরুল ইসলাম এবং পাঠশালা ও চারুকলার একদল তরুণ এতে সহযোগিতা করেন।

শুধু ৩৬ দিনের গল্প নয়

ফারুকী জানান, আলোচনার এক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে, জাদুঘরে শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনের ঘটনাই দেখানো হবে, নাকি এর পেছনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও তুলে ধরা হবে।

তার মতে, জুলাইকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো আন্দোলন হিসেবে দেখলে এর বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ধরা পড়বে না। তাই জাদুঘরের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের ইতিহাসকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এই ভাবনা থেকেই জাদুঘরের যাত্রা ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ দিয়ে শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়। এতে একাত্তর থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরার কথা বলা হয়েছে।

তিতুমীর, ফরায়েজি আন্দোলন, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, ওসমানী, মুক্তিযুদ্ধ, এরশাদের শাসনামল এবং বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অধ্যায়সহ বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসকে এতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়।

ফারুকী বলেন, জাদুঘরকে এমনভাবে তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল, যাতে এটি একবার দেখেই শেষ হয়ে না যায়। সময়ের সঙ্গে নতুন প্রদর্শনী ও কনটেন্ট যুক্ত করে দর্শকদের বারবার সেখানে ফেরানোর ব্যবস্থা রাখার চিন্তা ছিল।

জাদুঘরকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার পরিকল্পনা

জুলাই জাদুঘরকে শুধু প্রদর্শনীর জায়গা নয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার একটি কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান ফারুকী।

তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহান্তে সংগীত আয়োজনের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে পাবলিক টক আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। ঐতিহাসিক ঘটনা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে এসব আয়োজন করার চিন্তা করা হয়েছিল।

প্রবেশমুখে আবু সাঈদের স্মৃতি

ফারুকী জানান, জুলাই জাদুঘরে প্রবেশের মুখে একটি বিশেষ স্থাপনা করার ইচ্ছা ছিল তার। সেখানে আবু সাঈদের একটি লাইন-ড্রয়িং ধরনের ভাস্কর্য এবং তার নিচে ‘বাকিডি যায় না’ লেখা রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।

তার মতে, দর্শক জাদুঘরে প্রবেশের প্রথম মুহূর্তেই যেন জুলাইয়ের আবেগ ও শক্তি অনুভব করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এমন একটি স্থাপনার চিন্তা করা হয়েছিল। তবে সময়ের অভাবে এটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ দিয়ে শুরু, কবিতায় শেষ

ফারুকীর ভাষ্য অনুযায়ী, সিনেমা বা উপন্যাসের মতো জাদুঘরের শুরু ও শেষ নির্ধারণ করাও ছিল একটি কঠিন সিদ্ধান্ত।

শেষ পর্যন্ত জাদুঘরের শুরু ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ দিয়ে এবং শেষ হাসান রোবায়েতের একটি কবিতার পঙ্‌ক্তি দিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ দর্শক প্রবেশ করবেন বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে এবং বের হওয়ার সময় জুলাইয়ের শহীদদের পরিবারের বেদনার অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে যাবেন।

ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে একতরফাভাবে সমর্থন বা বিরোধিতা না করে যার যে ভূমিকা, তা সেভাবেই তুলে ধরার কথা জানান ফারুকী।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ৭ মার্চের ভাষণের পাশাপাশি ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাও রাখা হয়েছে। একইভাবে স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক পরিবর্তন, একদলীয় ব্যবস্থা, জিয়াউর রহমানের সময়, এরশাদের শাসন এবং ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ও ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ফারুকীর মতে, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে নিজের দেশ পরিচালনা, ভোটাধিকার এবং নিজেদের সরকার বেছে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে সংগ্রাম করেছে। সেই দীর্ঘ যাত্রার ধারাবাহিকতাতেই জুলাইয়ের ঘটনাকে দেখানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

Social Icons