ইরানে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের দুই সেনাকে ‘ভুয়া’ সাক্ষাৎকার দিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও পেন্টাগনের কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে জনমত ও বয়ান নিজেদের অনুকূলে গড়ে তুলতেই তাদের অভিজ্ঞতাকে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এ বছরের এপ্রিলে ইরানের আকাশে যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর দুই সেনাই প্যারাসুটে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে তাদের মধ্যে একজনকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা হলেও অপরজন ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দুই দিন আটকা ছিলেন।
‘৬০ মিনিটস’-এ সাক্ষাৎকার নিয়ে চাপের অভিযোগ
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএসের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এর নতুন মৌসুমের প্রথম পর্বে ওই ঘটনার ওপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচারের কথা রয়েছে।
সিএনএনের একাধিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমদিকে দুই সেনাই সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, কার্যত তাদের সাক্ষাৎকার দিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ উদ্ধার হওয়া দুই সেনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ‘ব্রাভো’ নামে পরিচিত একজন সেনা সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। তবে অপর সেনা ‘আলফা’ এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
একজনের পরিচয় গোপন রাখছে সিবিএস
সিবিএস জানিয়েছে, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া সেনাকে শুধু ‘ব্রাভো’ নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি ওই এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার এবং কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ইরানের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দুই দিন একা অবস্থান করার পর তাকে উদ্ধার করা হয়।
এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নিজের ঘটনা এবং উদ্ধার অভিযানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন তিনি।
অপরদিকে ‘আলফা’ নামে পরিচিত পাইলট সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে রাজি হননি। ওয়াশিংটন এখনো দুই সেনার কারও প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেনি।
হেগসেথের বিরুদ্ধে কেন উঠল অভিযোগ?
সিএনএনের দাবি, এই ঘটনা ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধকে ঘিরে জনমত প্রভাবিত করার একটি প্রচেষ্টার দিক তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হেগসেথ ওই দুই সেনার বেঁচে যাওয়া ও উদ্ধারের নাটকীয় ঘটনাকে সামনে এনে যুদ্ধের বিষয়ে একটি ইতিবাচক বয়ান তৈরি করতে চেয়েছিলেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে পেন্টাগন।
‘অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা’, দাবি পেন্টাগনের
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সিএনএনকে বলেছেন, প্রতিবেদনটি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট সেনাদের নিজেদের ছিল। কারণ এটি তাদের ব্যক্তিগত গল্প।
তিনি আরও বলেন, একজন সেনা সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অন্যজন নেননি। একই সঙ্গে অপারেশনাল নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্যের উৎস ও পদ্ধতি সুরক্ষিত রাখতে প্রতিরক্ষা বিভাগ সতর্ক ছিল।
যেভাবে ভূপাতিত হয়েছিল মার্কিন যুদ্ধবিমান
গত ৩ এপ্রিল ইরানের আকাশে মার্কিন এয়ার ফোর্সের এফ-১৫ই ‘স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এটিই ছিল ইরানের হাতে ভূপাতিত প্রথম মার্কিন যুদ্ধবিমান।
বিমানটিতে থাকা দুই সেনাই প্যারাসুটে বের হয়ে আসতে সক্ষম হন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ওই যুদ্ধ শুরু করার ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক দুর্বল করার কথা জানিয়েছিল।
একজন উদ্ধার হলেও অন্যজন আটকা পড়েন
বিমানটির পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা হয়।
কিন্তু ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার ইরানের দুর্গম এলাকায় আটকা পড়েন। তাকে উদ্ধারে মার্কিন বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে। একই সময়ে ইরানি বাহিনীও তাকে খুঁজতে থাকে।
ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্য দিয়েও মার্কিন উদ্ধার অভিযানকে সহায়তা করে। এমনকি নিখোঁজ মার্কিন সেনা যে এলাকায় অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সেখানে হামলাও পিছিয়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাহাড়ে একা প্রায় দেড় দিন
বিমান থেকে নামার সময় ওই ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার অচেতন হয়ে পড়েন এবং মাথায় আঘাত পান। ফলে প্রথমদিকে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
পরে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। এরপর ইরানি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে পাহাড়ি এলাকায় চলাচল করতে থাকেন।
ইসরাইলি প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ হেঁটে একটি পাহাড়ি ফাটলে লুকিয়ে ছিলেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষা করছিলেন।
প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর মার্কিন বিশেষ বাহিনী তার কাছে পৌঁছায়। তাকে উদ্ধারে ব্যাপক বিমান সহায়তাও দেওয়া হয়।
উদ্ধার অভিযানেও ছিল বড় ঝুঁকি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানি সেনারা বিপুল সংখ্যায় ওই মার্কিন সেনাকে খুঁজছিল এবং মার্কিন বাহিনী সেখানে পৌঁছানোর সময় তারা তার অবস্থানের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।
তাকে ও উদ্ধারকারী দলকে ইরান থেকে বের করে আনতে দুটি মার্কিন পরিবহন বিমান ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যন্ত একটি বিমানঘাঁটিতে গিয়ে বিমান দুটি আটকে পড়ে।
ইরানের হাতে বিমানগুলো চলে যাওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন বাহিনী সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। পরে বিকল্প বিমান পাঠিয়ে আহত কর্মকর্তাসহ উদ্ধারকারী দলকে ইরান থেকে বের করে আনা হয়।
এখন আলোচনায় ‘৬০ মিনিটস’-এর সাক্ষাৎকার
একদিকে পেন্টাগন জোর দিয়ে বলছে, সেনাদের সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। অন্যদিকে সিএনএনের সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ।
ফলে ইরানে ভূপাতিত যুদ্ধবিমান, প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পাহাড়ে আটকে থাকা মার্কিন সেনা এবং তাকে উদ্ধারের নাটকীয় অভিযানের পাশাপাশি ‘৬০ মিনিটস’-এর সাক্ষাৎকার ঘিরে নতুন বিতর্কও সামনে এসেছে।








