নারীদের প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের মধ্যে জরায়ুর ভেতরের স্তরের ক্যানসার বা এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। শরীরের কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে সাধারণ সমস্যা মনে করে এড়িয়ে গেলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হতে পারে। তবে এই ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়েই লক্ষণ প্রকাশ করে, ফলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে চিকিৎসার সুযোগ থাকে।
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার কী?
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার শুরু হয় জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ বা এন্ডোমেট্রিয়াম থেকে। গর্ভাবস্থায় এই অঙ্গেই ভ্রূণ বেড়ে ওঠে। মাসিক চক্রের সময় জরায়ুর ভেতরের আস্তরণ পুরু হয় এবং পরে মাসিকের মাধ্যমে ঝরে যায়।
এই স্তরের কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে টিউমার তৈরি করলে তাকে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার বলা হয়।
এটি সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে। টাইপ-১ ইস্ট্রোজেনের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত এবং তুলনামূলক ধীরে বাড়ে। অন্যদিকে টাইপ-২ তুলনামূলক কম দেখা গেলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যে লক্ষণগুলোতে সতর্ক হবেন
এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সংকেত হলো অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত।
- মেনোপজের পর রক্তপাত: মেনোপজের পর সামান্য রক্তপাত হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
- অতিরিক্ত বা অনিয়মিত মাসিক: দুই মাসিকের মাঝখানে রক্তপাত কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ও দীর্ঘস্থায়ী মাসিক।
- অস্বাভাবিক যোনিস্রাব: জলীয়, দুর্গন্ধযুক্ত বা রক্তমিশ্রিত স্রাব।
- তলপেট বা শ্রোণি অঞ্চলে ব্যথা।
- সহবাসের সময় ব্যথা।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। ফাইব্রয়েড, পলিপ বা হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাই সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
কিছু শারীরিক ও বংশগত কারণে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে:
- সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়স বা মেনোপজ-পরবর্তী সময়
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- অল্প বয়সে মাসিক শুরু হওয়া বা দেরিতে মেনোপজ হওয়া
- কখনো গর্ভধারণ না করা
- শুধুমাত্র ইস্ট্রোজেন হরমোন থেরাপি গ্রহণ
- PCOS ও ডায়াবেটিস
- লিন্চ সিন্ড্রোমের মতো বংশগত কারণ
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
কীভাবে রোগ শনাক্ত করা হয়?
অস্বাভাবিক রক্তপাত বা অন্যান্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসাউন্ড, এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসি, হিস্ট্রোস্কোপি ও ডিএন্ডসি।
বিশেষ করে বায়োপসির মাধ্যমে জরায়ুর আস্তরণ থেকে টিস্যু সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা কী?
রোগের স্টেজ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে:
- অস্ত্রোপচার, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী জরায়ু, ওভারি ও ফ্যালোপিয়ান টিউব অপসারণ করা হতে পারে।
- রেডিয়েশন থেরাপি
- কেমোথেরাপি
- হরমোন থেরাপি
- টার্গেটেড থেরাপি
- ইমিউনোথেরাপি
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
বিশেষ করে মেনোপজের পর যেকোনো রক্তপাত, অস্বাভাবিক মাসিক, দীর্ঘস্থায়ী যোনিস্রাব কিংবা তলপেটে অস্বাভাবিক ব্যথা হলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক








