বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগঠন, যাকে ঘিরে নানা সময়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। দলটির ইতিহাস, ১৯৭১ সালের ভূমিকা, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।
তার মরণোত্তর গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’-এ দলের ঐতিহাসিক বিবর্তন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ সংস্কারের উদ্যোগ এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ইসলামপন্থি রাজনীতির নানা প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন, ২০১৯ সালে দল থেকে পদত্যাগ এবং পরে এবি পার্টি গঠনের অভিজ্ঞতার আলোকে রাজ্জাক বইটিতে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
জামায়াতের রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে রাজ্জাকের বিশ্লেষণ
ব্যারিস্টার রাজ্জাক ১৯৬৭ সালে তরুণ ছাত্র হিসেবে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন এবং প্রায় ৩৩ বছর জামায়াতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন সম্পর্কে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল।
গ্রন্থটি সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে জামায়াতের ঐতিহাসিক বিবর্তনের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ভূমিকা, নীতিগত সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক মডেলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠার সময় ৭৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে অখণ্ড বাংলা থেকে একজন প্রতিনিধি ছিলেন। দলটি প্রতিষ্ঠার পরপরই সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতিতে না গেলেও ১৯৫৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি রাজনীতিতে অংশ নেওয়া শুরু করে। এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও রাজ্জাক প্রশ্ন তুলেছেন।
১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা
রাজ্জাকের বিশ্লেষণে জামায়াতের নীতিগত ভুলগুলোর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক অবস্থান।
তিনি ১৯৬৬ সালের ছয় দফার বিরোধিতা এবং জনগণের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থতাকেও গুরুত্বপূর্ণ ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের প্রতি জামায়াতের সমর্থন ছিল আরও গুরুতর সিদ্ধান্ত।
বইটির বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে জামায়াতের তৎকালীন নেতা গোলাম আযম বক্তব্য দিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের শূরার একটি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনী আক্রমণ করলে বা একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা হলে জামায়াত নিরপেক্ষ থাকবে।
কিন্তু ২৫ মার্চের সামরিক অভিযান ও পরবর্তী পরিস্থিতির পর জামায়াত ওই অবস্থান থেকে সরে যায় এবং পাকিস্তানি সামরিক শক্তিকে সমর্থন করে। রাজ্জাক তার বইয়ে এই অবস্থানকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুতর ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর সমালোচনা
১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়েও রাজ্জাক বইটিতে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন।
তার মতে, ২৫ মার্চ ঢাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জামায়াত নেতৃত্ব একটি সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন।
রাজ্জাকের বিশ্লেষণে, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকেও এসব কর্মকাণ্ডের সমর্থন করা সম্ভব ছিল না। তার মতে, এ অবস্থায় জামায়াতের সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করা উচিত ছিল।
তিনি আরও লিখেছেন, জামায়াত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলাম ধর্মকে এক করে দেখার কারণে একটি বড় রাজনৈতিক ভুল করেছিল।
১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ
স্বাধীনতার পর নিজেদের ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট আত্মসমালোচনা ও ক্ষমাপ্রার্থনা না করাকেও রাজ্জাক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।
গ্রন্থে বলা হয়েছে, রাজ্জাক নিজে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব পুনর্বহালের পর একটি ক্ষমাপ্রার্থনার খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেটি কার্যকর হয়নি।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পরও রাজ্জাকের উদ্যোগে ক্ষমা চাওয়ার একটি খসড়া তৈরি হয়। বইটির বিবরণ অনুযায়ী, কয়েকজন জামায়াত নেতা এতে সম্মত হলেও দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি।
২০০৫ সালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটিতেও বিষয়টি ওঠে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।
২০১৬ সালের গোপন সংস্কার প্রস্তাব
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ২০১৬ সালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার কাছে দেওয়া একটি গোপন খসড়া বিবৃতির বিবরণ।
সেখানে দুটি বড় প্রস্তাব ছিল। প্রথমত, ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য স্পষ্টভাবে ভুল স্বীকার করে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া। দ্বিতীয়ত, পুরোনো নামে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম শেষ করে নতুন নামে একটি আধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করা।
তবে জামায়াতের প্রবীণ ও রক্ষণশীল নেতৃত্বের আপত্তির কারণে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে দল বিলুপ্ত করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তও বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাজ্জাক জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন।
জামায়াতের সাংগঠনিক সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন
রাজ্জাকের মতে, জামায়াতের নেতৃত্ব পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ এবং মুক্তচিন্তার সুযোগ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার বিশ্লেষণে, দলের অভ্যন্তরে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রও সময়ের সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে।
তিনি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন ও দাওয়াতি সংগঠনের ভূমিকা আলাদা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তুরস্ক, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর ইসলামপন্থি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তার বিশ্লেষণে, জামায়াত পুরোনো মতাদর্শিক কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকার কারণে নিজেদের একটি আধুনিক নাগরিক রাজনৈতিক দল হিসেবে রূপান্তর করতে পারেনি।
কেন জামায়াতের সমালোচনা করেছিলেন রাজ্জাক
দলের দীর্ঘদিনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়েও প্রকাশ্যে জামায়াতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন রাজ্জাক।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইসলামি আন্দোলনকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা থেকেই তিনি এই সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে এবং সংস্কারকৃত একটি রাজনৈতিক সংগঠন সে ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
জামায়াতের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজ্জাকের প্রশ্ন
গ্রন্থের শেষদিকে জামায়াতের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজ্জাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যতে দলটির অবস্থান নির্ভর করবে তারা নিজেদের অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো কতটা সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে তার ওপর।
তিনি রাজনৈতিক পরিবর্তন, দূরদর্শিতা এবং সাংগঠনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ২০২৫ সালের মে মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর পর বইটি প্রকাশিত হয়। ফলে পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাফল্য সম্পর্কে তার কোনো প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন বইটিতে নেই।






