তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে ও তাত্ক্ষণিক তৃষ্ণা মেটাতে রাজধানীর ফুটপাত এবং সড়কের পাশের আখের রসের দোকানগুলোতে প্রতিদিন সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। তবে বাহ্যিকভাবে প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর মনে হলেও অনিয়ন্ত্রিত প্রস্তুতপ্রণালী, নোংরা পরিবেশ, মাছ সংরক্ষণে ব্যবহৃত দূষিত বরফ এবং কৃত্রিম মিষ্টিকারক স্যাকারিনের বেপরোয়া ব্যবহারে এই রস রূপ নিচ্ছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
রাজধানীর একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিক্রেতারা রস ঠান্ডা করতে যে বরফ ব্যবহার করছেন, তার অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর উৎস থেকে সংগৃহীত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মৌসুমি বিক্রেতা জানান, কম খরচে বেশি লাভ করতে তারা বরফকল কিংবা সরাসরি মাছের আড়ত ও মাছ পরিবহনে ব্যবহৃত কম দামি বরফ কিনে আনেন। এসব বরফ মানুষের পানের জন্য তৈরি বা জীবাণুমুক্ত নয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মৎস্য খাতে ব্যবহৃত বা দূষিত পানির বরফ পানীয়তে মেশালে বরফের ভেতরে থাকা মারাত্মক জীবাণু, ময়লা ও ভারি ধাতু সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আখের রস ফুটানো বা তাপ প্রক্রিয়াজাত করা হয় না বলে সরাসরি পরিবেশিত এই রসে ক্ষতিকর জীবাণু অবিকৃত থাকে।
বরফের পাশাপাশি আরও এক ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। রসের স্বাভাবিক মিষ্টি কম থাকলে কিংবা বেশি মিষ্টি করার লোভে কোনো কোনো অসাধু বিক্রেতা সরাসরি সিরিঞ্জ (Syringe) ব্যবহার করে রসে উচ্চমাত্রার কেমিক্যাল ও কৃত্রিম মিষ্টিকারক স্যাকারিন মিশিয়ে দিচ্ছেন। কোনো রকম পরিমাপ বা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই খাদ্যপণ্যে কেমিক্যালের এমন অননুমোদিত ব্যবহারে ভোক্তারা বড় ধরনের অঙ্গহানির ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ফুটপাতের এই স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. বেনজীর আহমেদ। তিনি সতর্ক করে বলেন, “অপরিষ্কার পানিতে তৈরি বরফ ও দূষিত যন্ত্রের মাধ্যমে রস পানে টাইফয়েড, জন্ডিস, ডায়রিয়া এবং হেপাটাইটিস ‘এ’-এর মতো সংক্রামক ব্যাধি অনায়াসে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আর রাসায়নিক উপাদান স্যাকারিন সরাসরি শরীরে প্রবেশ করলে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার ও কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
এর বাইরেও খোলা রাস্তার ধুলাবালি, ধোঁয়া, মাছি এবং এক পানিতে বারবার গ্লাস ধোয়ার ফলে আখের রস হয়ে উঠছে জীবাণুর আখড়া। তাই কেবল জরিমানা বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নয়, এসব ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশ নিরাপদ খাবার ও বরফের সরবরাহ নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
