GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / বিনোদন ও সংস্কৃতি / বিনোদন / কন্ট্রোল উদয়’ কেন আজও জনপ্রিয়, নানা পাটেকারকে ঘিরে স্মৃতিচারণ

কন্ট্রোল উদয়’ কেন আজও জনপ্রিয়, নানা পাটেকারকে ঘিরে স্মৃতিচারণ

বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার জনপ্রিয় চরিত্রগুলো। তবে নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে নানা পাটেকারের সঙ্গে প্রথম পরিচয় গম্ভীর কোনো চরিত্র দিয়ে নয়। বরং ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার উদয় শেঠি চরিত্র দিয়েই তিনি জেন-জি দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা করে নেন।

নানা পাটেকার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘আব তক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমায় শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এসব ছবিতে তার গম্ভীর উপস্থিতি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই অভিনেতাই যখন ‘ওয়েলকাম’-এ হাস্যরসাত্মক গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে হাজির হন, তখন সেটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় পরিবর্তন।

‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি

আনিস বাজমি পরিচালিত ‘ওয়েলকাম’ মুক্তি পায় ২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর। ছবির গল্পে উদয় শেঠি দুবাইভিত্তিক এক গ্যাংস্টার। তার জীবনের সবচেয়ে বড় চিন্তা নিজের বোন সঞ্জনার বিয়ে দেওয়া।

কিন্তু উদয়ের পরিবার অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় কোনো পরিবারই সঞ্জনার সঙ্গে সম্পর্ক করতে চায় না। পরিস্থিতি বদলাতে উদয়ের সহযোগী মজনু ভাই একজন উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে শুরু করেন।

একপর্যায়ে রাজীব নামের এক যুবকের সঙ্গে সঞ্জনার সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে রাজীবের মামা ড. ঘুংরু শর্ত দেন, উদয় ও মজনুকে অপরাধের জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এরপর দুই গ্যাংস্টারকে ভিন্ন পথে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। উদয় অভিনয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মজনু ছবি আঁকার চর্চা শুরু করে। এখান থেকেই সিনেমার একের পর এক হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতির জন্ম হয়।

‘ওয়েলকাম’-এ ক্যাটরিনা কাইফ, অক্ষয় কুমার, অনিল কাপুর, পরেশ রাওয়াল ও নানা পাটেকার অভিনয় করেন। ছবিতে আরডিএক্স চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ফিরোজ খান। এটি ছিল ২০০৯ সালে মৃত্যুর আগে তার শেষ সিনেমা।

উদয় চরিত্রে নানা পাটেকারকে নেওয়া ছিল ঝুঁকি

নানা পাটেকার তখন মূলত গম্ভীর ও কঠিন চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে পরিচিত। তাকে একজন হাস্যরসাত্মক গ্যাংস্টারের ভূমিকায় নেওয়া তাই নির্মাতাদের জন্য বড় সিদ্ধান্ত ছিল।

পরিচালক আনিস বাজমি পরে ‘দ্য কপিল শর্মা শো’-তে জানিয়েছিলেন, শুরুতে নানা পাটেকার চিত্রনাট্য শুনতেই আগ্রহী ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি বাজমির কাছে তার মায়ের নামে প্রতিশ্রুতি নেন।

এরপর প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাকে পুরো চিত্রনাট্য শোনানো হয়। গল্প শোনার পর নানা পাটেকার বাজমিকে জড়িয়ে ধরেন বলে জানান পরিচালক।

উদয় ও মজনুর জুটিও সিনেমাটির অন্যতম বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে। ‘মজনু ভাই’ নামটি অনিল কাপুরের প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে দুই চরিত্রের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক রসায়ন দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

নানা পাটেকারের অভিনয়ও ২০০৮ সালের বিভিন্ন পুরস্কারের আলোচনায় আসে। যে ধরনের কমেডি চরিত্রে দর্শক তাকে আগে কল্পনাই করেনি, সেই চরিত্রের জন্যই তিনি প্রশংসা পান।

গম্ভীর অভিনয়ই হয়ে গেল কমেডির শক্তি

উদয় শেঠি চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার গম্ভীরতা। নানা পাটেকার চরিত্রটিকে নিয়ে নিজে মজা করার চেষ্টা করেননি। বরং উদয় নিজেকে সত্যিকারের ভয়ংকর গ্যাংস্টার মনে করে, এমনভাবেই তিনি অভিনয় করেছেন।

কিন্তু চরিত্রটির চারপাশের ঘটনাগুলো ছিল হাস্যকর। এই বৈপরীত্য থেকেই তৈরি হয় সিনেমার বড় অংশের কমেডি।

একদিকে উদয় মানুষকে ভয় দেখাতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে সে চায় মানুষ তাকে ভালোবাসুক। একই সঙ্গে নিজের বোনের জন্য ভালো পাত্র খুঁজতে গিয়ে তাকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষায় পড়তে হয়।

অভিনয়ে যাওয়ার পরও তার আচরণে সেই গ্যাংস্টারের গাম্ভীর্য থেকে যায়। সাধারণ একটি সংলাপকেও সে এমন আবেগ নিয়ে বলত, যেন সেটি কোনো ঐতিহাসিক বক্তব্য। তার এই অতিরিক্ত সিরিয়াস আচরণই দৃশ্যগুলোকে আরও মজার করে তুলেছিল।

‘কন্ট্রোল উদয়’ থেকে মিমের দুনিয়া

‘কন্ট্রোল উদয়’ সংলাপটি সিনেমা পেরিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। উদয়ের নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, মুখের অভিব্যক্তি এবং হাতের ভঙ্গি মিলে তৈরি দৃশ্যটি পরে অসংখ্য মিমের উপকরণ হয়েছে।

শুধু এই সংলাপ ব্যবহার করতেই পুরো সিনেমার গল্প জানার প্রয়োজন হয় না। কোনো পরিস্থিতিতে রাগ বা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করার মজার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও তরুণরা এটি ব্যবহার করতে পারেন।

‘ভগবান কা দিয়া সব কুছ হ্যায়’ সংলাপটিও দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কেউ এটি নিজের প্রাপ্তি বা সামর্থ্য প্রকাশে ব্যবহার করেন। আবার কেউ মজা বা ব্যঙ্গ করেও সংলাপটি ব্যবহার করেন।

এভাবেই ‘ওয়েলকাম’-এর সংলাপগুলো সিনেমার বাইরেও নতুন জীবন পেয়েছে।

কেন নতুন প্রজন্মের কাছে উদয় এত জনপ্রিয়?

উদয় শেঠির সংলাপগুলো ছোট এবং সহজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস, স্টোরি কিংবা মিমে ব্যবহারের জন্য এমন সংলাপ সহজেই জনপ্রিয় হয়।

এর পাশাপাশি চরিত্রটির রাগ, হতাশা ও নিজের পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা অনেক তরুণের কাছে পরিচিত অনুভূতি। পরীক্ষা, পারিবারিক অনুষ্ঠান, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা যানজট, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ‘কন্ট্রোল উদয়’ কথাটি ব্যবহার করা যায়।

চরিত্রটির আরেকটি দিকও দর্শকদের আকর্ষণ করেছে। উদয় একজন গ্যাংস্টার হলেও নিজের বোনকে নিয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। তার সবচেয়ে বড় চাওয়া বোনের ভালো জায়গায় বিয়ে দেওয়া।

সে একই সঙ্গে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নও দেখে। কঠিন চেহারা ও অপরাধী পরিচয়ের আড়ালে থাকা এই কোমল দিক উদয়কে শুধু একটি কমেডি চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখেনি।

উদয় ও মজনুর বন্ধুত্বও তরুণ দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তারা পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া করে, ভয় পায় এবং বিপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুরাও অনেক সময় নিজেদের একজনকে ‘উদয়’ এবং অন্যজনকে ‘মজনু’ হিসেবে মজা করে চিহ্নিত করেন।

পারিবারিক চাপও ছিল গল্পের অংশ

‘ওয়েলকাম’-এর গল্পে শুধু গ্যাংস্টারদের কমেডি ছিল না। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও পারিবারিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।

উদয়কে প্রমাণ করতে হয় যে তার পরিবারও একটি সম্মানিত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের যোগ্য। আত্মীয়স্বজনের বিচার, বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক অবস্থান এবং পরিবারের সম্মান নিয়ে যে চাপ থাকে, সিনেমাটি সেটিকে হাস্যরসের মাধ্যমে তুলে ধরে।

ছবিটির ছোট ছোট দৃশ্যও পরে আলাদাভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। প্রায় ২ ঘণ্টা ৪১ মিনিটের সিনেমাটিতে এমন অনেক মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাদা ক্লিপ বা মিম হিসেবে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পরবর্তী সময়ে ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ সিনেমার মাধ্যমেও উদয় শেঠি চরিত্রটি দর্শকদের সামনে ফিরে আসে। ফলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে চরিত্রটির পরিচয় আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

নানা পাটেকারের কমেডির আসল শক্তি

কমেডিতে টাইমিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কখন সংলাপ বলতে হবে, কখন থামতে হবে এবং কোথায় শুধু অভিব্যক্তিই যথেষ্ট, নানা পাটেকারের অভিনয়ে এসব বিষয় স্পষ্ট ছিল।

তার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল তিনি উদয়কে কখনো স্রেফ একটি কমেডি চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তিনি চরিত্রটিকে নিজের কাছে সত্যিকারের একজন গ্যাংস্টার হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন।

ফলে দর্শক উদয়ের পরিস্থিতি দেখে হাসলেও চরিত্রটি নিজের কাছে কখনো হাস্যকর হয়ে ওঠেনি। বরং তার ভয়ংকর ভাবমূর্তি ও হাস্যকর পরিস্থিতির সংঘর্ষ থেকেই তৈরি হয়েছে কমেডি।

গম্ভীর চরিত্রে নানা পাটেকারের যে স্থিরতা দর্শককে ভয় পাইয়ে দিত, ‘ওয়েলকাম’-এ সেই একই স্থিরতা দর্শকদের হাসিয়েছে। কণ্ঠ, চোখের দৃষ্টি ও সংযত অভিনয় খুব একটা বদলায়নি। বদলে গিয়েছিল শুধু পরিস্থিতি।

নানা পাটেকারের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য শক্তিশালী চরিত্র রয়েছে। তবে নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে তার স্মৃতি হয়তো ‘উদয় শেঠি’ নামের সেই গ্যাংস্টার হিসেবেই সবচেয়ে উজ্জ্বল থাকবে। আর সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে দুই শব্দের একটি সংলাপ, ‘কন্ট্রোল উদয়!’

তথ্যসূত্র: দ্য স্টেটসম্যান

Social Icons