চীনা পণ্যের ক্রমবর্ধমান প্রবাহ ও বড় বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। ইউরোপের শিল্প খাতের ওপর চাপ বাড়ায় বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইইউ।
চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতিকে ইউরোপের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ইইউ নেতারা। এ অবস্থায় চীনা পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় কমিশনকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইইউর শীর্ষ বাণিজ্য প্রতিনিধিদল চীনে যাচ্ছে। সেখানে ইইউর বাণিজ্য প্রধান মারোস সেফকোভিচ এবং চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনটাওয়ের মধ্যে দুই দিনের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাসেলস এই বৈঠককে আলোচনার ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে দেখছে। এর আগে গত জুনে ব্রাসেলসে চীনের সঙ্গে আলোচনা হলেও বাণিজ্য ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এবার ইইউ অন্তত একটি প্রাথমিক সমঝোতার বাস্তব উদাহরণ দেখতে চায়। বিশেষ করে চীনা পণ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বেইজিং স্বেচ্ছায় কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
বাণিজ্য ঘাটতিই বড় উদ্বেগ
ইউরোপ-চীন বাণিজ্য উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৪ সালে চীনের সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০৬ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছায়।
অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর ঘাটতি ৪০০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আশঙ্কা।
ইউরোপের অভিযোগ, চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, সহজ ঋণ এবং উৎপাদন বাড়ানোর নীতির কারণে দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে অতিরিক্ত পণ্য ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করছে।
এর প্রভাব পড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন শিল্পে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল এবং রাসায়নিক শিল্প নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন পরিস্থিতিকে ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর কাছাকাছি বলে সতর্ক করেছেন। তার মতে, ইউরোপের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চীনের পালটা বক্তব্য
ইউরোপের অভিযোগ পুরোপুরি মেনে নেয়নি চীন। বেইজিংয়ের বক্তব্য, ইউরোপ-চীন বাণিজ্য ঘাটতির দায় এককভাবে চীনের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
চীনের যুক্তি, ইউরোপের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জলবায়ু নীতির কারণেও চীনা পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের সবুজ জ্বালানি রূপান্তর, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের কারণে ব্যাটারি, সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
বেইজিংয়ের দাবি, চীন মূলত ইউরোপের এই চাহিদাই পূরণ করছে।
তবে চীন আমদানি কোটা বা রপ্তানি সীমাবদ্ধতার মতো পদক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে আসন্ন আলোচনায় বেইজিং কতটা ছাড় দেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
চীনের কাছ থেকে কী চায় ইউরোপ?
বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় ইউরোপের অন্যতম লক্ষ্য হলো চীনের কাছ থেকে এমন কিছু পদক্ষেপ আদায় করা, যা ভবিষ্যৎ সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে।
ব্রাসেলস চায়, চীন কিছু নির্দিষ্ট খাতে স্বেচ্ছায় রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করুক। বিশেষ করে চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির প্রবাহ নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ বেশি।
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, স্বেচ্ছায় রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।
এ ছাড়া কৌশলগত খাতে চীনা আমদানি কমানো, চীনে ইউরোপীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতেও আগ্রহী ইইউ। এর মধ্যে বিরল মাটির খনিজ বা রেয়ার আর্থ অন্যতম।
জার্মানি-ফ্রান্সের কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব
চীনা পণ্যের প্রবাহ মোকাবিলায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জার্মানি ও ফ্রান্স। দেশ দুটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য নতুন একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এ বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে যৌথ প্রস্তাব দিয়েছেন।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটির লক্ষ্য হলো কোনো দেশের বাণিজ্যিক পদক্ষেপ ইউরোপীয় শিল্পের জন্য হুমকি তৈরি করলে ইইউ যেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্যারিস ও বার্লিনের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে ইউরোপীয় বাজারে কোনো দেশের নির্দিষ্ট পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা বন্ধ করার ক্ষমতা ইইউর হাতে থাকা উচিত। রাসায়নিক, প্লাস্টিক, গাড়ি এবং অন্যান্য কৌশলগত শিল্পকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেকশন ৩০১’-এর ইউরোপীয় সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন আইনের এই ব্যবস্থায় কোনো দেশের বাণিজ্যনীতি বা বাণিজ্যিক আচরণকে অন্যায্য মনে হলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পালটা ব্যবস্থা নিতে পারে।
ইউরোপও এখন বড় বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মতো একটি ব্যবস্থা চায়। তবে এমন পদক্ষেপ নিলে চীন ও ইইউর মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
চীন ইতোমধ্যে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে আসন্ন আলোচনায় সমঝোতা হয়, নাকি ইউরোপ-চীন বাণিজ্য সংঘাত আরও গভীর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট









