সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি এক হৃদয়বিদারক ও আবেগময় দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে—চুরির অপবাদে বাজারে খুঁটির সঙ্গে হাত-পা বেঁধে রাখা সারারাত অনাহারে থাকা বাবার মুখে রুটি ও চা তুলে দিচ্ছে এক অবুঝ ছোট্ট মেয়ে। বাবার প্রতি সন্তানের এই অবিচল ভালোবাসা ও সহমর্মিতার দৃশ্য ছুঁয়ে গেছে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষের হৃদয়। সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর এবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পরিবারটির ভাগ্য।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল বাজারের চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় সেই শিশুর পড়াশোনার যাবতীয় দায়িত্ব সশরীরে গিয়ে গ্রহণ করেছেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। একই সাথে শিশুটির বাবা রায়হানুল হক অনিক শিকদার ভুল পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে তাঁর জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
রোববার বিকেলে উজিরপুরের বামরাইল এলাকায় অনিকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন ইউএনও মো. আলী সুজা। এ সময় তিনি পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
সাংবাদিকদের ইউএনও বলেন, “পরিবারটির সঙ্গে কথা বলেছি। অনিক যদি তাঁর অতীত ভুল বা খারাপ অভ্যাস পরিবর্তন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন, তবে প্রশাসন থেকে তাঁর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি তাঁর এই নিষ্পাপ কন্যাসন্তানের লেখাপড়ার পূর্ণ দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।”
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে বামরাইল বাজারে ছিঁচকে চুরির কাল্পনিক অভিযোগ তুলে স্থানীয় কয়েকজন মিলে রায়হানুল হক অনিক শিকদারকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে সারারাত নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালায়। পরদিন শনিবার ভোরে খবর পেয়ে বাবার জন্য বাসা থেকে রুটি ও চা নিয়ে ছুটে আসে তাঁর ছোট্ট মেয়ে। বাবার অমানবিক কষ্ট দেখে পরম মমতায় নিজের হাতে চা-রুটি খাইয়ে দেয় সে।
উপস্থিত জনতার সামনে ওই শিশুটি দৃঢ়কণ্ঠে বলে, “আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। আমার বাবা কখনো চুরি করতে পারেন না।”
অনিকের স্ত্রীর দাবি, অনিক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হলেও কতিপয় বন্ধুদের প্ররোচনায় একসময় মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে তিনি চুরির সঙ্গে কোনোদিন জড়িত ছিলেন না; বরং পূর্বশত্রুতার জেরে স্থানীয় একটি পক্ষ অন্যায়ভাবে চুরির অপবাদ দিয়ে তাঁকে নির্যাতন করেছে। স্থানীয় প্রবাসফেরত ওমর খসরু তুহিন জানান, অনিক শিক্ষিত ও মার্জিত ছেলে হলেও মাদকের কারণে তাঁর পরিবারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ভিডিওটি নজরে আসার পর ‘উই আর বাংলাদেশ’ (WAB) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও শিশুটি ও তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা এস এম আকবর জানান, অনিক স্বাভাবিক কর্মমুখী জীবনে ফিরতে একটি অটোভ্যান চেয়েছেন। WAB Foundation-এর পক্ষ থেকে তাঁকে খুব দ্রুত একটি অটোভ্যান কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ ওই পরিবারটিকে আর্থিক ও মানসিকভাবে সহায়তা করতে যোগাযোগ করছেন।
