আদালতের মূল নথি চুরি করে লাখ টাকার বিনিময়ে তৈরি করা হতো জাল রায়। বিচারকের সিল-স্বাক্ষর নকল করে এসব ভুয়া রায়ে আসামিকে খালাস বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হতো। তদন্তে উঠে এসেছে, কাজের ধরন ও ঝুঁকি অনুযায়ী ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি হতো। এই জালিয়াতির সঙ্গে আইনজীবী, মুহুরি, উমেদার ও কম্পিউটার অপারেটরদের একটি সিন্ডিকেট জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এর আগে ঢাকার অধস্তন আদালতে বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে রায় তৈরির বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে আদালত ও পুলিশ প্রশাসনে তৎপরতা শুরু হয়। পরবর্তী তদন্তে চক্রটির চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
নথি চুরি করে জাল রায় তৈরির কৌশল
তদন্ত ও জবানবন্দি অনুযায়ী, চক্রটির কাজ শুরু হতো আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহের মাধ্যমে। কোনো মামলার তথ্য পেনড্রাইভে করে কম্পিউটারে নেওয়া হতো। এরপর সেই তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা হতো ভুয়া আদেশ বা রায়।
জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে রায় প্রিন্ট করার পর সংশ্লিষ্ট বিচারকের স্বাক্ষর ও আদালতের সিল নকল করে সেটিকে আসল রায়ের মতো তৈরি করা হতো। এসব নথিতে কোনো আসামিকে খালাস বা অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ থাকত।
পরে সেই ভুয়া রায়ের কপি আসামি বা তাদের স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে গেলে জাল রায়ের কপি দেখিয়ে দাবি করা হতো, ওই ব্যক্তি মামলায় খালাস পেয়েছেন। এভাবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি মূল মামলার নথি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হতো।
আদালতের নথি চুরিতে উমেদারদের সহযোগিতা
তদন্তে আদালতের নথি চুরির ক্ষেত্রে উমেদারদের সহযোগিতার তথ্যও সামনে এসেছে। ঢাকার দুটি আদালত থেকে মামলার নথি সরানোর ঘটনায় উমেদারদের ঘুষ দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
এক ঘটনায় ১ হাজার টাকা এবং অন্য একটি ঘটনায় একই পরিমাণ টাকা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, উমেদাররা আদালতের সরকারি কর্মচারী না হলেও নিয়মিত নথি আনা-নেওয়া এবং বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাধীচক্র তাদের মাধ্যমে সংরক্ষিত নথিতে প্রবেশের সুযোগ পেত।
এজলাস থেকে চুরি হয় মূল নথি
গত ২ জুলাই ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-২ আদালতে একটি মামলার মূল নথি দেখার কথা বলে আইনজীবীর মুহুরি পরিচয়ে এক ব্যক্তি প্রবেশ করেন। পরে আদালতের উমেদারের সহযোগিতায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর ৪০৯/২১-এর মূল নথি দেখার সুযোগ পান তিনি।
এর কিছুক্ষণ পর বিচারক উমেদারকে পাশের চেম্বারে ডাকলে সেই সুযোগে ব্যক্তি নথিটি নিয়ে পালিয়ে যান। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে নথি হাতে আদালতের করিডর ও সিঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
এ ঘটনায় মামলা হলে তদন্তের একপর্যায়ে আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল ওরফে ‘মুরগি রাসেল’কে গ্রেফতার করা হয়।
রাসেলের তথ্যেই গ্রেফতার অর্পা
রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুগদা এলাকা থেকে জামিলা আক্তার ওরফে অর্পাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাসার আলমারি থেকে চুরি যাওয়া দুটি মূল নথি উদ্ধার করা হয়েছে।
এর মধ্যে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা নম্বর ৪০৯/২১ এবং অন্যটি ভাটারা থানার মামলা নম্বর ৪৭(৭)/২০২০-এর নথি।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অর্পা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা ৪০৯/২১-এর আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রবির স্ত্রী। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিচারিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত বা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে নথি দুটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
কম্পিউটারে মিলেছে ১৫টি ভুয়া রায়ের কপি
তদন্তে চক্রের আরও সদস্যের সন্ধান পায় পুলিশ। রাসেলের জবানবন্দিতে নোটারি আইনজীবী আসমা খাতুনের নাম উঠে আসে। পরে গত ২২ আগস্ট ঢাকার আইনজীবী সমিতি ভবন থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
এরপর আদালত এলাকার একটি কম্পিউটার প্রতিষ্ঠানের অপারেটর আহসান হাবীবকেও গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা ৪০৯/২১-এর ভুয়া রায়ের কপি তার কম্পিউটার থেকেই তৈরি করা হয়েছিল।
আহসানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার পরীক্ষা করে একটি ফোল্ডারে অন্তত ১৫টি মামলার ভুয়া রায়ের সফটকপি পাওয়া গেছে। এসব মামলার মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ভাটারা, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, তুরাগ, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ, লালবাগ ও যাত্রাবাড়ী এলাকার মামলাও রয়েছে।
কম্পিউটারটি জব্দ করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এসব ভুয়া রায়ের কোনগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
৫০ হাজার থেকে লাখ টাকায় হতো চুক্তি
জবানবন্দি ও তদন্তে চক্রটির অর্থ লেনদেনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিভিন্ন কাজের জন্য ৫০ হাজার, ৭০ হাজার এবং ১ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তির তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, কাজের ধরন, ঝুঁকি এবং মামলার গুরুত্ব অনুযায়ী টাকার পরিমাণ বাড়ত। এ কাজে অসাধু আইনজীবী, আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মচারী, উমেদার, মুহুরি ও কম্পিউটার অপারেটরদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
চক্রের পরিধি নিয়ে চলছে তদন্ত
পুলিশের অভিযানে চুরি যাওয়া দুটি মূল নথি উদ্ধার এবং একটি কম্পিউটার থেকে অন্তত ১৫টি ভুয়া রায়ের সফটকপি পাওয়ার পর চক্রটির বিস্তৃতি নিয়ে তদন্ত আরও জোরদার হয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন খুঁজে দেখছেন, এসব ভুয়া রায় তৈরির পেছনে আর কারা জড়িত এবং আদালতের আরও কোনো নথি একইভাবে চুরি বা বিকৃত করা হয়েছে কি না।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।









