GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / প্রথম পাতা / প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের সম্ভাবনা, বাংলাদেশের সংবিধান কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের সম্ভাবনা, বাংলাদেশের সংবিধান কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের সম্ভাবনা, বাংলাদেশের সংবিধান কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে

বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সামরিক-প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হলে দেশের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা ও সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ রয়েছে।

সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ এর আগে কোনো আঞ্চলিক সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এমন কোনো জোটে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে এর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ

চলতি বছরের ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির আওতায় তিন সদস্য দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো। এর আওতায় সামরিক সহযোগিতা, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং সামরিক উৎপাদন বাড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।

চুক্তি ঘোষণার পর বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ এতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। তবে ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান জানান, বর্তমানে চুক্তির সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই। ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইতিবাচক অবস্থান

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও বক্তব্য এসেছে। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা এবং এটি মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে বলেও তিনি জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও ২৪ ও ৩০ আগস্ট গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে।

অন্যদিকে ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন।

সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়নের বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

এই অনুচ্ছেদে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধাকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করার কথাও বলা হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশ যদি কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত সংবিধানের বিদ্যমান নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে সাংবিধানিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, মক্কা চুক্তি বা অন্য কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার প্রশ্নে সংবিধানের নীতিগত অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি।

তার মতে, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও বাংলাদেশ মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং নিরস্ত্রীকরণের নীতিগত অবস্থান অনুসরণ করেছে।

তাই কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমানও বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নির্দেশনার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং বিশ্বশান্তির প্রতি অঙ্গীকার। ফলে কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক নীতি ও নির্দেশনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।

বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ধারণা, প্রতিরক্ষা কৌশল এবং পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আগ্রহ বাড়ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে কৌশলগত সংলাপের কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যেও এর আগে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরব লিগ, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি ‘আরব ন্যাটো’ এবং ইসলামিক সামরিক জোটের মতো ধারণাও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

তবে নতুন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হবে, এর সদস্যদের দায়বদ্ধতা কতটা শক্তিশালী হবে এবং যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

পূর্ণ সদস্য না হয়েও সহযোগিতার সুযোগ

মাহফুজুর রহমানের মতে, বাংলাদেশ যদি মনে করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে সামরিক শিল্পের বিকাশ, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে, তাহলে শুরুতেই পূর্ণ সদস্য হওয়ার পরিবর্তে সীমিত বা শিথিল সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে সামরিক-প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং সংবিধানের নির্দেশনা একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতি বা প্রতিরক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।

Social Icons