GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / শেষ পাতা / জ্বালানি সংকটে নতুন বিপদ | বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়বে?

জ্বালানি সংকটে নতুন বিপদ | বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়বে?

জ্বালানি সংকটে নতুন বিপদ | বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়বে?

হরমুজ প্রণালির পর এবার বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে, বাড়তে পারে জ্বালানির দাম। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে।

ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

বাব আল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এই রুট দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ তেল-গ্যাসের বাণিজ্য এই প্রণালির মাধ্যমে হয়ে থাকে।

হুথিরা এই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হতে পারে। আর সেটি ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হবে।

হুথিদের নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনে লোহিত সাগরের পুরো উপকূলের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে। প্রণালি থেকে জাহাজ বের হওয়ার সংকীর্ণ পথের কাছাকাছিও তারা নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে।

এর আগে বন্দরনগরী মোচার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়েছে।

হুথিরা জানিয়েছে, সৌদি আরব ছাড়া অন্য দেশগুলোর জন্য প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে তারা বলেছে, ওয়াশিংটন তাদের ওপর হামলা না চালালে মার্কিন জাহাজ আটকাবে না।

বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ও কাতার থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব আল-মান্দেবকে বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই প্রণালিতেও যদি বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি আমদানির চাপ আরও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ এলএনজি হরমুজ-নির্ভর পথে আসত।

ফলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই সরবরাহ সংকট তৈরি হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা

বাব আল-মান্দেব দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে।

সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে পারে অপরিশোধিত তেলের দাম। এর প্রভাব শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে। শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে। ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাহাজকে ঘুরতে হবে আফ্রিকা দিয়ে

বাব আল-মান্দেব দিয়ে নিরাপদে চলাচল সম্ভব না হলে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে এশিয়ার দিকে যেতে হতে পারে।

এতে জাহাজের সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব ও সময় উভয়ই বাড়বে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রার সময় ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

ফলে জাহাজের জ্বালানি খরচ, বীমা ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের চাপ পড়তে পারে আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর।

এশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার শঙ্কা

বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো এশিয়ার বড় অর্থনীতিও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশভেদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ আমদানি করা জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

তাই হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবেও যদি বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়, তাহলে তা এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।

সৌদি আরবও পড়েছে চাপে

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মান্দেব গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই পথও ঝুঁকিতে পড়লে সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা এরই মধ্যে বিভিন্ন হামলার কারণে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এদিকে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে হুথিদের কথিত আন্তঃসীমান্ত হামলার ঘটনাও নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।

হরমুজেও নতুন হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিও আরও উত্তপ্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইলের আঘাত লাগে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হয়।

অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।

ফলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব, দুই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথেই নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।

বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

হরমুজ প্রণালির সংকটের পর বাব আল-মান্দেবেও যদি জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি আমদানি আরও ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় ও শিল্প উৎপাদন খরচ একসঙ্গে বাড়লে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থাৎ, হরমুজের সংকটের পর বাব আল-মান্দেবের সম্ভাব্য সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে উঠতে পারে।

Social Icons