GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / প্রথম পাতা / বিচার চাইতে গিয়ে নারীই হয়রানির শিকার, থানায় নারী কর্মকর্তার তীব্র সংকট

বিচার চাইতে গিয়ে নারীই হয়রানির শিকার, থানায় নারী কর্মকর্তার তীব্র সংকট

স্পর্শকাতর মামলায় ভুক্তভোগীদের বাড়ছে ভোগান্তি

ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে অনেক নারীকে নতুন করে মানসিক অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কারণ, এসব মামলার তদন্তে পর্যাপ্ত নারী কর্মকর্তা না থাকায় অনেক সময় পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছেই ঘটনার বিস্তারিত বলতে বাধ্য হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবেদনশীল এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ও শারীরিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন হয়। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা পুরুষ হলে অনেক নারী, বিশেষ করে কিশোরী ও প্রান্তিক পর্যায়ের ভুক্তভোগীরা লজ্জা, ভয় কিংবা সংকোচের কারণে প্রয়োজনীয় তথ্য স্বাভাবিকভাবে জানাতে পারেন না। এতে তদন্ত প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সম্প্রতি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক কিশোরীর ধর্ষণের অভিযোগের তদন্তে এমন পরিস্থিতি সামনে আসে। গত ২৪ জুলাই ওই কিশোরী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অভিযুক্ত আবদুল্লাহ-আল মামুনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তদন্তের দায়িত্ব পান পিবিআইয়ের পরিদর্শক ইব্রাহিম খলিল।

কিন্তু ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা, জিজ্ঞাসাবাদ, ডিএনএ পরীক্ষা ও সুরতহালের মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় কিশোরীটি পুরুষ কর্মকর্তার সামনে অস্বস্তিতে পড়েন। শেষ পর্যন্ত এসব কাজে একজন নারী এএসআইয়ের সহায়তা নিতে হয়।

আরেকটি ঘটনায় রাজধানীর কদমতলীতে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করা এক নারীও তদন্ত প্রক্রিয়ায় হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। গত ১৬ এপ্রিল ওই নারীকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে মেহেদী হাসান ফারহান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। পরদিন তিনি থানায় মামলা করেন।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা এসআই সোহেলের বিরুদ্ধে ওই নারী অভিযোগ করেন, তদন্তের নামে তাকে ফোনে ও থানায় ডেকে বিভিন্ন ধরনের হয়রানিমূলক কথা বলা হয়েছে। এমনকি অভিযুক্তদের গ্রেফতারের পরিবর্তে তাকেই দোষী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের বিভিন্ন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আসা ভুক্তভোগীদের অনেকেই পর্যাপ্ত নারী কর্মকর্তা না থাকায় একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন।

নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য থানাগুলোতে বিশেষ সার্ভিস ডেস্ক থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত নারী কর্মকর্তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে নারী কনস্টেবলরা প্রাথমিক অভিযোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু মামলার তদন্ত, সুরতহালসহ গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাদের না থাকায় শেষ পর্যন্ত পুরুষ এসআইদেরই দায়িত্ব নিতে হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাহিনীতে নারী সদস্যের সংখ্যা ১৭ হাজার ৯১৩ জন। কিন্তু তাদের মধ্যে নারী সাব-ইন্সপেক্টর মাত্র ৯৯৮ জন। আবার এই কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন দপ্তর ও সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে দেশের অনেক থানায় নারী এসআইয়ের পদ খালি থাকছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত নারী কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানো গেলে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষ পদোন্নতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৫৫ জন নারী এএসআই দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের দ্রুত এসআই পদে উন্নীত করা হলে থানাগুলোতে নারী তদন্ত কর্মকর্তার ঘাটতি কিছুটা পূরণ হতে পারে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ধর্ষণের মতো ঘটনায় মামলার প্রয়োজনে ভুক্তভোগীকে অনেক ব্যক্তিগত বিষয় বিস্তারিত বলতে হয়। পুরুষ তদন্ত কর্মকর্তা থাকলে অনেক নারী লজ্জা ও সংকোচের কারণে সেসব তথ্য সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। ফলে কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই থেকেও সরে যেতে পারেন।

সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদাও মনে করেন, নারী নির্যাতনের মামলার তদন্তে কর্মকর্তাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে হয়। পুরুষ কর্মকর্তা তদন্ত করতে পারবেন না এমন নয়, তবে নারী তদন্ত কর্মকর্তা থাকলে অনেক ভুক্তভোগী বেশি স্বস্তি পান।

তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন করে দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে পুলিশের ভেতরে থাকা যোগ্য নারী সদস্যদের পদোন্নতির মাধ্যমে দ্রুত এই ঘাটতি পূরণ করা প্রয়োজন। এতে স্পর্শকাতর মামলায় ভুক্তভোগী নারীরা যেমন স্বস্তিতে কথা বলতে পারবেন, তেমনি বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

Social Icons