রংপুরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী রংপুর টাউন হল আজ নিজেই অস্তিত্ব সংকটে। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা একসময় উত্তরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে এখন ভবনটির বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
১৮৯১ সালে নির্মিত এই টাউন হলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস। নাট্যচর্চা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে স্থাপনাটি।
এই স্থাপনা তৈরির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল কাকিনার রাজা মহিমা রঞ্জন রায়ের। শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। রংপুর অঞ্চলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিতে তিনি জমি দানসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন।
এরও আগে, ১৮৮৫ সালে তৎকালীন রঙ্গপুর নাট্য সমাজ একটি নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। পরে ১৮৯১ সালে রাজা মহিমা রঞ্জন রায় নাট্য সমাজকে রঙ্গশালা নির্মাণের জন্য ১০ বিঘা ৩ কাঠা জমি দান করেন। সেই জমির অংশেই গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক টাউন হল।
একসময় এই স্থানে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো। দেশের ইতিহাসের বহু পরিচিত ব্যক্তিত্বের পদচারণায়ও সমৃদ্ধ হয়েছে টাউন হল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও সরোজিনী নাইডুসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এখানে এসেছেন।
শুধু সাংস্কৃতিক ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও এই ভবনের রয়েছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক স্মৃতি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী টাউন হলকে নারীদের ওপর নির্যাতনের একটি কেন্দ্রে পরিণত করেছিল বলে স্থানীয় ইতিহাস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়। মুক্তিকামী অনেক নারী ও তরুণীকে সেখানে ধরে এনে নির্যাতন করা হয়। যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা সেখান থেকে নির্যাতিত অনেক নারীকে উদ্ধার করেন।
নির্যাতনের শিকার ও নিহত অনেকের মরদেহ টাউন হলের পেছনের এলাকায় মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কিছু মরদেহ আবার ভবনের কাছের একটি কুয়ায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু স্মৃতিচিহ্ন উত্তরবঙ্গ জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কুয়ার কাছেও স্থাপন করা হয়েছে একটি স্মৃতিফলক।
এত গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বহন করা সত্ত্বেও বর্তমানে টাউন হলের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ভবনের ভেতরের নকশা ও পলেস্তারা বিভিন্ন জায়গায় খসে পড়ছে। অনেক চেয়ার নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েকটি কক্ষও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী মোহাম্মদ জুন্নুন বলেন, রংপুরের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে টাউন হল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু সংস্কারের অভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখন নানা সমস্যায় ধুঁকছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে একসময় এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি হারিয়ে যেতে পারে।
নাট্য ব্যক্তিত্ব বিপ্লব প্রসাদও টাউন হলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, রংপুরের বহু অভিনয়শিল্পীর বিকাশে এই মঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখান থেকে তৈরি হওয়া অনেক শিল্পী পরবর্তীতে দেশের নাটক ও চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্থাপনাটির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে। রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) রমিজ আলম জানান, এটি একটি প্রাচীন স্থাপনা এবং এর অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের জন্য আর্থিক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে এখনো প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা রংপুর টাউন হল এখন সংস্কারের অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে ভবনটির ঐতিহাসিক কাঠামো রক্ষা করা না গেলে শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, রংপুরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ও হারিয়ে যেতে পারে।








