রাস্তায় জরিমানা ও শাস্তির মুখে পড়েন চালকরা, ধরাছোঁয়ার বাইরে বিনিয়োগকারীরা
রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট। এতে বাড়ছে যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অটোরিকশায় বিনিয়োগ করছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ সদস্য, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও বাসা-বাড়ির মালিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় তারা এসব অটোরিকশা দিনমজুর ও নিম্নবিত্ত মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন। অথচ রাস্তায় চলাচলের সময় জরিমানা, মামলা ও শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছেন মূলত চালকরাই। বিনিয়োগকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ চালকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার পেছনে বিনিয়োগ করা অর্থ প্রান্তিক চালকদের নয়। বিত্তশালী শ্রেণির বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। প্রভাবশালীরা একাধিক অটোরিকশা কিনে ভাড়া দিচ্ছেন এবং অনেকে অবৈধ কারখানাও গড়ে তুলেছেন। তার মতে, চালকদের বেপরোয়া হওয়ার পেছনে এসব প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর জন্য সড়কশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি অটোরিকশা
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, খিলগাঁও, সবুজবাগ, বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে প্রায় চার হাজার অটোরিকশা গ্যারেজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব গ্যারেজের অধীনে চলছে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি অটোরিকশা।
অটোরিকশার মালিকদের মধ্যে বাসা-বাড়ির মালিক, আমলা, পুলিশ সদস্য, রাজনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ী রয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
একটি অটোরিকশা থেকে চালকের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। অর্থাৎ মাসে প্রায় ১৫ হাজার এবং বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আয় হয় মালিকের। অথচ একটি নতুন অটোরিকশা তৈরিতে খরচ হয় আনুমানিক ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি দ্রুত লাভের ব্যবসা হয়ে উঠেছে।
লাইসেন্স ও নিবন্ধন ছাড়াই চলছে
এসব অটোরিকশার অধিকাংশ চালক দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নিম্নআয়ের মানুষ। বিনা পুঁজিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তারা অটোরিকশা চালাচ্ছেন।
তবে অনেক চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই এবং গাড়িরও আইনি নিবন্ধন নেই। তারপরও তারা রাজধানীর ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চলাচল করছেন।
মানিকনগরের একটি গ্যারেজের মালিক মেহেদি বলেন, আগে অটোরিকশার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ গ্যারেজ মালিকদের হাতে ছিল। এখন বেশি লাভের আশায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে বিনিয়োগ করছেন।
আরেক গ্যারেজ মালিক আব্দুল্লাহ বলেন, রিকশার ব্যবসা এখন উচ্চবিত্তদের হাতে চলে গেছে। অনেক বাসা মালিকের এক-দুটি অটোরিকশা রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদেরও অটোরিকশা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অটোরিকশা বন্ধের অপেক্ষায় প্যাডেলচালিত রিকশার মালিকরা
অটোরিকশার বিস্তারের কারণে অনেক গ্যারেজে এখন প্যাডেলচালিত রিকশা বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ কেউ অটোরিকশা বন্ধ হওয়ার আশায় পুরোনো রিকশা সংরক্ষণ করছেন।
একটি গ্যারেজের ম্যানেজার জুবায়ের জানান, তাদের গ্যারেজে আগে ২০০টি প্যাডেলচালিত রিকশা ছিল। এখন একটিও চলছে না। মালিকের নতুন অটোরিকশা কেনার সামর্থ্য না থাকায় বর্তমানে গ্যারেজ ভাড়া দিয়েই তাদের চলতে হচ্ছে।
শাস্তি শুধু চালকদের
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে মাঝেমধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। প্রধান সড়কে উঠলে চালকদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা, ডাম্পিং, সিট জব্দ ও কেবল সংযোগ বিচ্ছিন্নের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চালকদের অভিযোগ, এসব অভিযানে সব অটোরিকশাকে সমানভাবে আইনের আওতায় আনা হয় না। বিশেষ করে প্রভাবশালীদের মালিকানাধীন অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে তাদের দাবি।
মতিঝিল এলাকার অটোরিকশাচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, মামলা ও জরিমানার টাকা চালকদেরই দিতে হয়। মালিকরা শুধু দিনের শেষে ভাড়ার টাকা নিয়ে যান।
আরেক চালক রুবেল হোসেনের অভিযোগ, সাধারণ মালিকদের অটোরিকশার বিরুদ্ধেই বেশি মামলা হয়। অনেক সময় টাকা দিলে মামলা এড়ানো যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রধান সড়কেও অটোরিকশার দাপট
রাজধানীর শাপলা চত্বর, পল্টন, রাজারবাগ ও মালিবাগ এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রধান সড়কেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। অনেক চালক উলটো পথে চলছেন, যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছেন এবং ট্রাফিক সিগন্যালও মানছেন না।
অতিরিক্ত গতি, প্রতিযোগিতা করে চলাচল ও প্রধান সড়কে প্রবেশের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এসব চালকের বিরুদ্ধে সবসময় দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগে ছিল চাঁদার অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অবৈধ অটোরিকশা ‘চাঁদার জোরে’ চলত। টোকেনের মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, কাউন্সিলর ও সংসদ-সদস্যদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও চাঁদার ভাগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
তবে বর্তমানে রিকশা গ্যারেজ পরিচালনার ক্ষেত্রে কাউকে চাঁদা দিতে হয় না বলে দাবি করেছেন মালিকরা। এরপরও বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা কীভাবে রাস্তায় চলছে এবং কেন কার্যকরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।






