জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ ঠিকানা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৭ নম্বর কেবিন অবশেষে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা এই ঐতিহাসিক কক্ষটি এখন পরিষ্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে কক্ষটির ঐতিহাসিক আবহ অক্ষুণ্ন রেখেই আরও আধুনিকভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বি-ব্লকের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এই কক্ষেই জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। অথচ দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীদের অনেকেই জানতেন না কক্ষটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
সম্প্রতি কক্ষটি পরিদর্শন করে দেখা যায়, সেখানে নজরুলের বিভিন্ন সময়ের ছবি, তাঁর সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকার ছবি, নজরুলের বই ও নজরুলবিষয়ক বিভিন্ন সৃষ্টিকর্ম সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রয়েছে কবির একটি আবক্ষ ভাস্কর্যও।
সংরক্ষিত আছে নজরুলের ব্যবহৃত সামগ্রী
কেবিন নম্বর ১১৭-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে সেই বিছানা, যেখানে জাতীয় কবি চিকিৎসা নিয়েছিলেন এবং জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। পাশাপাশি তাঁর ব্যবহৃত ড্রেসিং টেবিলও অক্ষত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
বিছানার পাশে রাখা হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য একটি মন্তব্য খাতা। সেখানে অনেকে কক্ষটি পরিদর্শনের অনুভূতি লিখেছেন এবং নজরুলের বই ও ই-বুক রাখাসহ বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন।
কক্ষটিতে নজরুলময় পরিবেশ তৈরি করতে তাঁর বিভিন্ন গানের মিউজিকও বাজানো হচ্ছে।
প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা
বিএমইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত নজরুল স্মৃতিকক্ষটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।
নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই কক্ষ দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসছেন। বিশেষ করে নজরুলপ্রেমী ও গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে কক্ষটি ঘিরে।
দীর্ঘদিন ছিল অবহেলায়
কেবিন নম্বর ১১৭ দীর্ঘ সময় যথাযথভাবে সংরক্ষিত ছিল না। একসময় এটি রোগীদের জন্যও নিয়মিত বরাদ্দ দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে কক্ষটি কখনো কিচেন রুম, কখনো বসার জায়গা, আবার কখনো ধূমপানের স্থান কিংবা স্টোর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
নজরুল গবেষকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে কক্ষটি সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করার দাবি জানানো হলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
২০০২ সালে নজরুল গবেষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কক্ষটির নামফলকসহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। এরপর সময়ের সঙ্গে কক্ষটি আবারও স্টোর হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
পরে নজরুল গবেষকদের সমালোচনার মুখে ২০১৬ সালের দিকে কক্ষটিতে কিছুটা সংস্কার করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও অবহেলায় পড়ে যায় ঐতিহাসিক এই স্থান।
এবার হচ্ছে আধুনিকায়ন
সম্প্রতি নজরুল বর্ষ উপলক্ষ্যে কক্ষটি সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ। প্রথম ধাপে কক্ষটি পরিষ্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
বিএমইউর রেজিস্ট্রার ডা. মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, জাতীয় কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকেই কক্ষটি অক্ষত অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে হাসপাতালটি চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত মানুষের ভিড় তৈরি না করেও গবেষক ও আগ্রহীদের জন্য কক্ষটি আরও উপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তার মতে, কক্ষটির পূর্বের আবহ অক্ষত রেখেই সংস্কার করা হবে এবং শিগগিরই কাজটি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
থাকবে নজরুলের রচনাসমগ্র ও গবেষণাকর্ম
আধুনিকায়নের পর কক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনাসমগ্র এবং নজরুলকে নিয়ে বিশেষ গবেষণাকর্ম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি ঐতিহাসিক বিভিন্ন আলোকচিত্রও সেখানে সংযোজন করা হবে। বিএমইউর জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রশান্ত মজুমদার জানিয়েছেন, নজরুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ছবিগুলোও কক্ষে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কক্ষটি আধুনিকায়নের জন্য ইতোমধ্যে বিএমইউর প্রকৌশল শাখায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
নজরুলের শেষ জীবনের সাক্ষী কেবিন ১১৭
১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই কবিকে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০-বি নম্বর বাসা থেকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ১১৭ নম্বর কেবিনে ভর্তি করা হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট এই হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
অর্থাৎ কেবিন নম্বর ১১৭ শুধু একটি হাসপাতালের কক্ষ নয়, এটি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে আরও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার প্রত্যাশা করছেন নজরুলপ্রেমী ও গবেষকরা।








