চট্টগ্রামে চার বছরের শিশু আবু হুরাইরা জুরাইজকে অপহরণের অভিযোগের পর তাকে উদ্ধারের জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন তার মা সুরাইয়া আক্তার। কিন্তু শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এমনকি মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগও উঠেছে।
ভুক্তভোগী মায়ের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশের কথা জানানো হলেও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে বলেছেন, ‘তোমার সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না।’ তবে তদন্ত কর্মকর্তা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কীভাবে অপহৃত হয় শিশুটি?
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে সুরাইয়া আক্তারের সঙ্গে আবু সালেহ জুবাইরের বিয়ে হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তাদের ছেলে আবু হুরাইরা জুরাইজের জন্ম হয়।
পরবর্তীতে দাম্পত্য কলহের জেরে ২০২২ সালের জুনে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর শিশুটিকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান সুরাইয়া।
চলতি বছর শিশুটিকে সীতাকুণ্ডের একটি নুরানি মাদ্রাসায় প্লে শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। ভর্তির জন্য জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজন হলে শিশুটির বাবা জন্মনিবন্ধন করে দেওয়ার কথা জানান।
এরপর শিশুটির চাচা মো. ইদ্রিস জন্মনিবন্ধনের কপি নেওয়ার জন্য সুরাইয়াকে চান্দগাঁও থানার কামাল বাজার এলাকার একটি বাসায় যেতে বলেন।
গত ৮ জুন শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান সুরাইয়া। অভিযোগ অনুযায়ী, বাসার সামনে পৌঁছানোর পর ইদ্রিস জোর করে তার কোল থেকে শিশুটিকে নিয়ে যান।
এরপর শিশুটির মাকে মারধর করে বাড়ির বাইরে রাস্তায় অচেতন অবস্থায় ফেলে রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
মামলা করতে ভয় দেখানোর অভিযোগ
ঘটনার পর মুন্না হাসান নামে এক ব্যক্তি সুরাইয়ার মেসেঞ্জারে শিশুটিকে উদ্ধারের বিষয়ে পুলিশে অভিযোগ বা মামলা করলে তাকে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ভয়ে প্রথমে থানায় মামলা করেননি সুরাইয়া। পরে আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে গত ২৩ আগস্ট চান্দগাঁও থানায় মামলা করা হয়।
এরপর ২৬ আগস্ট কামাল বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. ইদ্রিসের স্ত্রী উর্মি আক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
তবে শিশুটিকে এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে জানিয়েছে পরিবার।
মায়ের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার অবনতি
শিশুকে হারিয়ে সুরাইয়া খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার বড় বোন সুফিয়া আক্তার কলি।
তার দাবি, শিশুটিকে উদ্ধারের বিষয়ে দুশ্চিন্তায় সুরাইয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং কয়েকবার খিঁচুনি দিয়ে অচেতন হয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টিকে পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন এবং শিশুটিকে উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
আইওর বিরুদ্ধে মায়ের গুরুতর অভিযোগ
সুরাইয়ার অভিযোগ, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই মুহাম্মদ ফারুক হোসেন তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন।
তার দাবি, আদালতের নির্দেশের প্রসঙ্গ তুললে তদন্ত কর্মকর্তা তাকে বলেন, ‘তোর সন্তান উদ্ধারের দায়িত্ব আমার না।’
এ ছাড়া তার আইনজীবী নিয়োগ নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সুরাইয়া।
হিজাব ও নেকাব পরা নিয়েও তদন্ত কর্মকর্তা তাকে আপত্তিকর কথা বলেছেন বলে অভিযোগ তার।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন এসআই মুহাম্মদ ফারুক হোসেন।
পুলিশের বক্তব্য কী?
চান্দগাঁও থানার এসআই মুহাম্মদ ফারুক হোসেন জানিয়েছেন, তিনি বাদীর সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণ করেননি।
তার দাবি, শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য মামলার দুই নম্বর আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে মামলার এক নম্বর আসামি চট্টগ্রামের বাইরে থাকায় তাকে এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেছেন, শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
‘আমার সন্তান কোথায়, জানি না’
সুরাইয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন তার চার বছরের সন্তানকে নিয়ে। শিশুটি কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কিংবা জীবিত আছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য না পাওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন।
তার বক্তব্য, জন্মের পর থেকে শিশুটিকে নিজের কাছেই বড় করেছেন। এমনকি তার হাত ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে শিশুটি খাবারও খেত না বলে দাবি করেছেন তিনি।
এখন সন্তানকে ছাড়া কীভাবে বাঁচবেন, সেই প্রশ্নই বারবার করছেন অসহায় এই মা।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান ও তদন্ত চলছে। ফলে আদালতের নির্দেশ, মায়ের অভিযোগ এবং পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।







