বুকে বা মূত্রনালিতে সংক্রমণ কিংবা কয়েক দিন ধরে চলা জ্বর অনেকেরই হয়ে থাকে। যথাযথ চিকিৎসায় অধিকাংশ মানুষ সুস্থও হয়ে ওঠেন। তবে কখনো কখনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। এই গুরুতর অবস্থাকে সেপসিস বলা হয়, যা দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ মেডিসিন বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক চিকিৎসক ডা. সুরঞ্জিত চ্যাটার্জির মতে, সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার কারণে যখন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তখন তাকে সেপসিস বলা হয়। এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন ও চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রথমে বোঝা নাও যেতে পারে গুরুতর পরিস্থিতি
ডা. চ্যাটার্জি এমন এক রোগীর উদাহরণ দিয়েছেন, যিনি জ্বর, দ্রুত হৃদস্পন্দন ও কিডনির সংক্রমণের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। পরীক্ষায় মূত্রনালির সংক্রমণ ধরা পড়ে এবং চিকিৎসাও শুরু হয়।
কিন্তু চিকিৎসার পরও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং হৃদস্পন্দন আরও বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ কমতে শুরু করে।
পরে প্রাথমিক রোগনির্ণয় নতুন করে বিবেচনা করলে দেখা যায়, সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়েছে এবং শরীরে গুরুতর প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ মূত্রনালির সংক্রমণ থাকলেও সেটিই পুরো সমস্যার কারণ ছিল না।
চিকিৎসকের মতে, সংক্রমণের চিকিৎসা চলার পরও রোগীর অবস্থার অবনতি হলে প্রাথমিক রোগনির্ণয় পুনর্বিবেচনা করা এবং সংক্রমণের জটিলতা বা অন্য কোনো সংক্রমণের উৎস আছে কি না, তা খুঁজে দেখা জরুরি।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হতে হবে
সেপসিস সবসময় শুরুতেই নাটকীয় লক্ষণ নিয়ে দেখা দেয় না। অনেক সময় সাধারণ সংক্রমণ ভালো না হওয়ার মতো উপসর্গ দিয়েই এর শুরু হতে পারে। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
- উচ্চ জ্বর অথবা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া;
- স্বাভাবিকের তুলনায় শ্বাস-প্রশ্বাস বা হৃদস্পন্দন অনেক বেড়ে যাওয়া;
- হঠাৎ বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক তন্দ্রা বা সজাগ থাকতে সমস্যা হওয়া;
- ত্বক ফ্যাকাশে, ছোপছোপ বা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া;
- কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া;
- সংক্রমণের তুলনায় অস্বাভাবিক মাত্রায় দুর্বলতা বা অবসাদ দেখা দেওয়া।
বিশেষ করে এসব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে কিংবা সংক্রমণে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
সব মানুষের ক্ষেত্রে গুরুতর সংক্রমণ বা সেপসিসের ঝুঁকি সমান নয়। নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এমন ওষুধ সেবনকারীদেরও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশে ডেঙ্গু, স্ক্রাব টাইফাস ও লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো সংক্রমণও গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে। রোগীর উপসর্গ, অবস্থান ও সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস বিবেচনায় এসব রোগের বিষয়ও চিকিৎসকদের মাথায় রাখতে হয়।
চিকিৎসার পরও অবস্থা খারাপ হলে
সংক্রমণের চিকিৎসা চলার পরও রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট বাড়লে, বিভ্রান্তি দেখা দিলে, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব হলে, অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়লে, রক্তচাপ কমে গেলে কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ অসুস্থতার শুরুতে যে রোগনির্ণয় করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত সঠিক থাকবে এমন নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হলে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।
দ্রুত শনাক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ
সেপসিসের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা রোগীর পরিণতিতে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সংক্রমণের ধরন ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে অ্যান্টিবায়োটিক, শিরায় তরল, অক্সিজেন, নিবিড় পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হতে পারে।
গুরুতর অবস্থায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা বজায় রাখতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাড়িতে বসে নির্ভরযোগ্যভাবে সেপসিস শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কোনো সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির হঠাৎ বিভ্রান্তি, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাবের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়া, খুব কম রক্তচাপ, চরম দুর্বলতা বা দ্রুত অবনতিশীল উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
সংক্রমণের অবস্থা হঠাৎ খারাপের দিকে গেলে সেটিকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করানো জরুরি। সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা প্রাণঘাতী সেপসিসে রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।





