কক্সবাজারের উখিয়ায় অভিযানের সময় এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠা বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম কিবরিয়াকে নগদ অর্থ পুরস্কার দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান। একই ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
রোববার বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই অভিযুক্ত এসআইকে পুরস্কৃত করার ঘটনা সামনে আসে। এতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে পুলিশ সূত্রের দাবি, ইয়াবা উদ্ধার ও একজনকে গ্রেফতারের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁদের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অভিযানে উদ্ধার হয়েছিল কত পিস ইয়াবা?
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর উখিয়ার থাইংখালী এলাকায় ছৈয়দুল বশর ওরফে সিসি বশরকে আটক করে পুলিশ। এসআই গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ওই অভিযানে অংশ নেয়।
অভিযোগকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী সরওয়ারের দাবি, অভিযানে মোট দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু এসআই কিবরিয়াকে বাদী করে দায়ের করা মামলার এজাহারে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ নিয়ে বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা সরিয়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে এসআই কিবরিয়ার বিরুদ্ধে। সরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, সরিয়ে ফেলা ইয়াবাগুলো পরে মাদক কারবারিদের কাছে এক কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।
তবে ইয়াবা আত্মসাৎ ও বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল কিংবা আদালতে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কেন পুরস্কার দেওয়া হলো এসআই ও ওসিকে?
পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযানে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার এবং একজনকে গ্রেফতারের স্বীকৃতি হিসেবে এসআই গোলাম কিবরিয়া ও সংশ্লিষ্ট ওসিকে নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
জেলা পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এসপি এমন সিদ্ধান্ত নেবেন, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত মাসিক সভায় এ ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়।
একদিকে অভিযানে উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে একই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তদন্তের আশ্বাস দিলেন রেঞ্জ ডিআইজি
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য তাঁকে পাঠানোর অনুরোধ জানান তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কত পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল, জব্দ তালিকা ও মামলার এজাহারে কেন ভিন্ন পরিমাণের কথা এসেছে এবং বাকি ইয়াবার বিষয়ে কী ঘটেছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম এ ঘটনায় প্রশ্ন তুলে বলেন, এমন একজন ব্যক্তি কীভাবে কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার পুলিশ সুপার হন, তা তাঁর বোধগম্য নয়। তাঁর অভিযোগ, এএনএম সাজেদুর রহমান কক্সবাজারে যোগ দেওয়ার পর থেকে পুলিশের হেফাজত থেকে ইয়াবা গায়েব হওয়ার ঘটনা যেন নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুলিশ সুপার বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের শাস্তি না দিয়ে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নজর তদন্তের দিকে
কক্সবাজারে ইয়াবা উদ্ধার নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং অভিযুক্ত এসআইকে পুরস্কার দেওয়ার ঘটনা ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কত পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল, অভিযোগ অনুযায়ী বাকি এক লাখ পিসের কী হয়েছে এবং পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।









