বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক কোটি টাকার বেশি আমানত আছে—এমন হিসাবের সংখ্যা ৩৩ হাজার ৬২৯ থেকে বেড়ে ৪০ হাজার ৬৪৫ হয়েছে।
দেড় বছরের ব্যবধানে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৭ হাজার ১৬টি হিসাব। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। হিসাবগুলোতে টাকার পরিমাণ বাড়ার এই ধারাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ প্রতিবেদনের আলোচনায় উঠে এসেছে।
কত টাকা, কত হিসাব—ধারাটা কোন দিকে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এসব হিসাবে জমা ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এরপর ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। সময়ের ব্যবধানে সামগ্রিকভাবে বড় অঙ্কের হিসাব জমার হারও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
স্বাভাবিক অর্থনীতি নাকি অন্য প্রভাব?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির মতো বাস্তবতায় এত স্বল্প সময়ে কোটি অঙ্কের হিসাবের প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই অর্থ প্রবাহের উৎস কতটা বৈধ ও প্রমাণযোগ্য।
এক বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন খাতে নতুন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান হতে পারে। চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে জমা হয়ে থাকলে কোটি টাকার হিসাব বাড়তে পারে—এমন ধারণাও আলোচনায় আছে।
ক্ষমতার বদলে নতুন শ্রেণি গঠনের ইঙ্গিত
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিনও মনে করেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী একটি শ্রেণি তৈরি হয়েছে। তাদের হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের ঘরে থাকা নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা হওয়ার বিষয়টি এই ব্যাখ্যার পক্ষে যথেষ্টভাবে মেলেনি।
নগদ কমল না—তবু হিসাব বাড়ছে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের বাইরে জনগণের হাতে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শুধু নগদ টাকা ব্যাংকে আসার চিত্রে ব্যাখ্যাটি বসানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের ১৬টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং আরও কয়েকটি ব্যাংকে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নজরদারি ও তদারকি জোরদার করেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কোটি টাকার হিসাব বাড়তে পারে। তবে এর পেছনে অবৈধ বা অপ্রদর্শিত অর্থের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রবাসী পাঠকদের জন্য প্রাসঙ্গিক দৃষ্টি
ব্যাংকিং খাতের এই পরিবর্তন বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে কতটা মিলে যাচ্ছে, তা বোঝা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, খরচ ও সঞ্চয়ের প্রবণতা, এবং ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থার বিষয়গুলোও বৃহত্তর চিত্রে প্রভাব ফেলে।
কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে কি না? হ্যাঁ। সংখ্যা ৩৩ হাজার ৬২৯ থেকে বেড়ে ৪০ হাজার ৬৪৫ হয়েছে।
কত টাকা জমা ছিল ও এখন? ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা; ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বেড়ে হয় ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক কী বলছে? সুশাসনে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং অবৈধ উৎস প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: এই বিভাগের সর্বশেষ খবর
সূত্র: jagonews24.com









