শ্রমবাজারে বিশাল অংশ, সুরক্ষায় ঘাটতি

বাংলাদেশের শ্রমশক্তির বড় অংশই বেসরকারি খাতে। সেখানে কর্মীর সংখ্যাও বেশি, কিন্তু আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো গড়ে ওঠেনি—এই বাস্তবতাই প্রশ্ন তুলেছে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বৈষম্য নিয়ে।
দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট কর্মজীবী মানুষের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লাখের মতো—অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে তারা খুবই ছোট অংশ। বাকি অংশের বড়টাই বেসরকারি খাতে কাজ করে। তবু এই খাতে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা সীমিত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বেসরকারি কর্মীদের মাত্র ৪ শতাংশ কোনো সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ছিলেন। তুলনায় সিঙ্গাপুরে হার অনেক বেশি, মালয়েশিয়ায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি; ভিয়েতনামেও তা মোটামুটি উচ্চ।
নীতির ঘাটতি, নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা
বৈষম্যকে আকস্মিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখছেন না বক্তারা। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, এটি নীতির অনুপস্থিতির ফল এবং নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় বেসরকারি কর্মীদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির কাঠামোয় রাখা প্রবণতার প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রশ্ন সামনে আনার চেষ্টা হয়েছে বলে বলা হয়।
এদিকে মার্সার গ্লোবাল পেনশন সূচকের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, শীর্ষ গ্রেডের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনায় বাংলাদেশে কোনো শক্ত কাঠামো কার্যকরভাবে দেখা যাচ্ছে না। ফলে কেবল কর্মঘণ্টা বা আয় নয়—অবসরের পর নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পেনশন প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা চাই
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কার্যকর পেনশন তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি এসেছে—এ কথাকে স্বাগত জানিয়ে বলা হয়েছে, কেবল পেনশনের কথা যথেষ্ট নয়। পুরো কর্মজীবনের সুরক্ষার জন্য সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দরকার।
তবে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে—নীতিমালা তৈরির প্রক্রিয়ায় এমন লোকদের প্রাধান্য দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যাঁরা বেসরকারি কর্মীদের সমস্যার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচিত নন। এমন হলে চাপিয়ে দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে বলেও মত দেওয়া হয়েছে।
কেন ভাতা-সুবিধায় ব্যবধান, করেও ব্যবধান
দুই ধরনের কর্মীদের সুবিধা ও কর কাঠামোর পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি কর্মীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, উৎসব ভাতা এবং বাংলা নববর্ষ ভাতাসহ বহু ধরনের সুবিধা পান। অবসরের পরও কিছু সুবিধা চলতে থাকে বলেও উল্লেখ আছে। করের বিষয়েও বলা হয়েছে—সেখানে কর আরোপ হয় মূল বেতনের ওপর, এমনভাবে।
অন্যদিকে বেসরকারি কর্মীরা মূল বেতন আর কয়েকটি উৎসব বোনাসের বাইরে অপেক্ষাকৃত কম সুবিধা পান। করও বেশি পরিসরে প্রযোজ্য হয় বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে—সব ভাতার ওপর কর দেওয়ার বিষয়টি বৈষম্যমূলক। এই ব্যবধানকে অগ্রহণযোগ্য বলে মত দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব: মজুরি বোর্ড, নিয়োগে বেতন পরিসর, বাধ্যতামূলক পেমেন্ট
বৈষম্য কমাতে প্রস্তাব হিসেবে বলা হয়েছে, শিল্প খাতভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করে মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং ভবিষ্য তহবিলে অবদান নিয়োগপত্রে বাধ্যতামূলক করা উচিত। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের পরিসর উল্লেখ বাধ্যতামূলক করলে দর-কষাকষিতে কর্মীর অসহায়ত্ব কমবে বলেও ধারণা দেওয়া হয়েছে।
শ্রম আইনে কর্মী মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলের বিধান আছে বলে উল্লেখ করা হয়—যেখানে কোম্পানির নিট মুনাফার একটি অংশ কর্মীদের মধ্যে বিতরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই বিধানের প্রয়োগ নিয়মিত নয় বলে অভিযোগ আছে। নতুন নীতিমালায় ওই অংশের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বার্ষিক বোনাসের একটি বড় অংশ সরাসরি পেনশন বা ভবিষ্য তহবিলে জমা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
প্রবাসী পাঠকের জন্য প্রশ্ন
১) আপনার কর্মজীবনে কি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আছে?
থাকলে কী ধরনের—পেনশন, স্বাস্থ্য, ভবিষ্য তহবিল—সেটা জানতে চান আপনি। না থাকলে কেন এবং কীভাবে সুরক্ষায় জোর দেওয়া দরকার, সেটাও ভাবতে হবে।
২) নিয়োগে বেতন-সুবিধার স্বচ্ছতা কতটা আছে?
বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের পরিসর ও ভাতার কাঠামো স্পষ্ট হলে দর-কষাকষির চাপ কমে।
৩) পেনশনের প্রতিশ্রুতি কাজে নামাতে কী দরকার?
শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—আইন, বাস্তবায়ন ও নিয়মিত প্রয়োগই আসল চাবিকাঠি।
আরও পড়ুন: এই বিভাগের সর্বশেষ খবর
সূত্র: prothomalo.com









