ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত শুরুর পর গত আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮১টি যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সামরিক উড়োজাহাজের আনুমানিক মূল্য ৩৩০ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা ও তদন্ত সংস্থা কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ৫ অক্টোবর প্রতিবেদনটি কংগ্রেসে জমা দেওয়া হয়।
সিআরএসের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ১২টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল, একটি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ এবং দুটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর গুলিতে তিনটি এফ-১৫ই বিমান ভূপাতিত হয়। এ ঘটনাকে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরের মাসে ইরানের আকাশে সামরিক অভিযানের সময় আরও একটি এফ-১৫ই ধ্বংস হয়।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে ইরানের হামলার সময় আরও আটটি এফ-১৫ই বিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর অত্যাধুনিক এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানও এই সংঘাতে ক্ষতির মুখে পড়ে। ১৯ মার্চ ইরানের হামলার সময় একটি এফ-৩৫এ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেটি মেরামত করে আবার সামরিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে ড্রোন। সিআরএসের সর্বশেষ তালিকায় অন্তত ৪৫টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন রয়েছে। নজরদারি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কাজে এসব ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষতির কারণে মে মাস নাগাদ মার্কিন বিমানবাহিনীর এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের সংখ্যা ১৩৫টিতে নেমে আসে। অথচ ওই সময়ে মার্কিন বাহিনীর প্রয়োজন ছিল অন্তত ১৮৯টি মোতায়েনযোগ্য রিপার ড্রোন।
সিআরএসের তালিকায় আরও রয়েছে সাতটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার। এসব বিমান আকাশে থাকা যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ করে। তালিকায় একটি ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান, দুটি এমসি-১৩০জে কমান্ডো-২ এবং একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন-২ উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও রয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া সামরিক সরঞ্জামের তালিকায় একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন, তিনটি এমকিউ-১ ড্রোন, একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার, চারটি এএইচ-৬ লিটল বার্ড এবং একটি এমএইচ-৬০ সিহক হেলিকপ্টার রয়েছে।
তালিকায় থাকা ই-৩ সেন্ট্রি বিমানটির ক্ষতিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এই বিমান আকাশপথে নজরদারি এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোয়িং ৭০৭-এর কাঠামোর ওপর তৈরি এই বিমান মার্কিন বাহিনীতে আগে থেকেই সীমিত সংখ্যায় ছিল।
সিআরএসের সর্বশেষ হিসাবটি মে মাসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ৪২টি উড়োজাহাজের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তবে এর অর্থ এই নয় যে মে মাসের পর নতুন করে আরও ৩৯টি বিমান ধ্বংস হয়েছে।
সিআরএস জানিয়েছে, নতুন তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি আগে প্রকাশ্যে না আসা ক্ষতির তথ্য যুক্ত হওয়ায় তাদের হিসাব পরিবর্তিত হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে এই সংখ্যাও পরিবর্তিত হতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর জুনের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওই অভিযান শেষ হওয়ার ঘোষণা দেন।
তবে সামরিক অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী মাসগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অভিযান ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে। এরপর সামরিক হামলায় কিছুটা বিরতি দেখা গেলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনো রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির অবনতি হলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট









