চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রায় ১৪ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন শি জিনপিং। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের অবস্থান, সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন তিনি।
শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের প্রভাব আরও বিস্তৃত করেছে। এর অন্যতম বড় উদাহরণ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কাছে চীনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ও রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন শি। এতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেইজিংয়ের প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়েছে বলে মনে করা হয়।
তবে শি জিনপিংয়ের আমলে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কও জটিল হয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে উত্তেজনা, তাইওয়ানকে ঘিরে চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তুলেছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও শি জিনপিং বড় পরিবর্তন এনেছেন। তার শাসনে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিনজিয়াং, তিব্বত ও হংকংয়ে চীনা সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এ নীতির গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সরকারের সমর্থকদের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এর ফলে নাগরিক স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে।
শি জিনপিং তার নিজের নামে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শও প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর নাম ‘নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা’। চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই মতাদর্শকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে চীনের দুই সাবেক প্রেসিডেন্টের কেউই নিজেদের নামে এমন একটি মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হওয়ার পথও তৈরি হয়েছে তার শাসনামলে। চীনের সংবিধান থেকে প্রেসিডেন্টের মেয়াদসংক্রান্ত সীমা তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে তিনি প্রচলিত দুই মেয়াদের বেশি সময়ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শি জিনপিংকে সাধারণত কঠোর ও গম্ভীর নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও তার এমন ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।
তবে বিভিন্ন সময়ে তার ব্যক্তিগত রসবোধের দিকও প্রকাশ পেয়েছে। ফুটবলের প্রতি নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তিনি। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনে চীনা জাতীয় ফুটবল দলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশার কথাও রসিকতার সঙ্গে বলেছেন।
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে এক গ্লাস বিয়ার পান করার ঘটনাও আলোচনায় এসেছিল।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে চীনে তৈরি শাওমি ফোন উপহার দেওয়ার সময় ফোনটিতে কোনো ‘ব্যাকডোর’ আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার বিষয়ে রসিকতা করেছিলেন শি।
সব মিলিয়ে, প্রায় দেড় দশকের নেতৃত্বে শি জিনপিং চীনের রাজনৈতিক কাঠামো, বৈশ্বিক কূটনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে নিজের প্রভাব শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার আমলেই চীন একদিকে আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়িয়েছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণও আরও জোরদার করেছে।
সূত্র: বিবিসি









