ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নামার সময় পদদলিত হয়ে মৃত্যুর অভিযোগ করেছেন নিহতদের স্বজনেরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনারের দাবি, আগুনের ঘটনায় কেউ পদদলিত হয়ে মারা যাননি; দুজনের মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিকভাবে।
এ ঘটনায় ফুলবাড়ীয়া উপজেলার পল্লিচিকিৎসক শাহজাহান মোল্লা ও সিএনজি চালক রমজান আলী মারা গেছেন। তাদের পরিবারের দাবি, আগুনের ঘটনায় সৃষ্ট আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ির কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
শাহজাহান মোল্লার বাড়ি ফুলবাড়ীয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামে। সোমবার তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হলে স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, আগুন লাগার পর শাহজাহানকে কাঁধে করে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়া হয়। এতে তারা পড়ে গেলে মানুষের চাপে শাহজাহান পদদলিত হন।
শাহজাহানের স্ত্রী হারিছা বেগম বলেন, সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর তিনি ও তার বড় বোন জাহানারা কাঁধে করে শাহজাহানকে সিঁড়ি দিয়ে নামাচ্ছিলেন। এ সময় পেছন থেকে ধাক্কা দিলে তারা সিঁড়িতে পড়ে যান। এরপর মানুষ তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়। তিনিও আঘাত পেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারেন, শাহজাহান মারা গেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সমালোচনা করে হারিছা বেগম দাবি করেন, কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি দেখেনি, অথচ তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন।
অন্যদিকে রমজান আলী বেশ কিছুদিন ধরে বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার স্ত্রী খাদিজা আক্তার বলেন, আগুন লাগার পর আতঙ্কে রমজান সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়ে যান। কয়েকজন তাকে ওপরে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।
খাদিজা আক্তারের দাবি, আগুনের ঘটনা ও আতঙ্ক সৃষ্টি না হলে তার স্বামী হয়তো বেঁচে যেতেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা এখন সর্বস্বান্ত।
এদিকে আগুনের ঘটনায় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে নিহত ফুলবাড়ীয়ার শাহজাহান ও রমজান আলী এবং তারাকান্দার কুলসুম বেগমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, আগুনের ঘটনায় কেউ পদদলিত হয়ে মারা যাননি। তাদের দাবি, যে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, তারা স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন।
ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
তবে লিফট ব্যবস্থাপনায় অবহেলার অভিযোগ ওঠা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ দুজনকে তদন্ত কমিটিতে রাখায় এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাইন উদ্দিন খান বলেন, এতে তদন্তে কোনো প্রভাব পড়বে না। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন, অতিরিক্ত চাপের কারণে লিফটে দুর্ঘটনা ঘটেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। আতঙ্কে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া রোগী ও স্বজনেরা সকাল থেকে আবার ওয়ার্ডে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে আগুনের ভয়াবহতা দেখা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে। হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে আহত অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি আগুনের ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করবে।
তবে নাগরিক নেতারা অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।


