ইসলামে বদনজর (নজর লাগা) একটি বাস্তব ও প্রমাণিত বিষয়। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এটি সত্য এবং মানুষের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বদনজর থেকে বাঁচতে যেমন সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, তেমনই রাসুলুল্লাহ (সা.) শেখানো দোয়া ও আমলেরও নিয়মিত চর্চা করা উচিত।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বদনজরের কারণে ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ) করানোর নির্দেশ দিতেন।
আবার জামে তিরমিজিতে হজরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! জাফরের সন্তানদের খুব বেশি বদনজর লাগে। আমি কি তাদের জন্য ঝাড়ফুঁক করাবো?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। কারণ যদি কোনও জিনিস তাকদিরকে অতিক্রম করতে পারতো, তবে তা হতো বদনজর।’
এসব হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বদনজর একটি সত্য বিষয়। এর প্রভাব কখনও কখনও গভীর হতে পারে। তাই কোনও সুখবর, বিশেষ নিয়ামত বা অর্জন নিয়ে বদনজরের আশঙ্কা থাকলে তা অযথা সবার সামনে প্রকাশ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংযম অবলম্বন করা যেতে পারে।
তবে শুধু সতর্ক থাকাই যথেষ্ট নয়; বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও আমল নিয়মিত করা উচিত।
সহিহ হাদিসে এসেছে, হজরত জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এ দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন—
بِاسْمِ اللّٰهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللّٰهُ يَشْفِيكَ، بِاسْمِ اللّٰهِ أَرْقِيكَ
অর্থ: আল্লাহর নামে আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি। যেকোনও কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক হিংসুক ব্যক্তি ও বদনজরের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আল্লাহর নামেই আমি আপনাকে ঝাড়ফুঁক করছি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দৌহিত্র হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে এ দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন—
أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
অর্থ: আমি তোমাদের উভয়কে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, প্রত্যেক শয়তান, প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর (বদ) নজর থেকে।
তিনি আরও বলতেন, হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর দুই পুত্র ইসমাইল ও ইসহাক (আ.)-কেও এভাবেই ঝাড়ফুঁক করতেন।
এছাড়া বদনজর থেকে সুরক্ষার জন্য নিয়মিত সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করা এবং নিম্নোক্ত দোয়াগুলো পড়া উত্তম।
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার সব অনিষ্ট থেকে।
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللّٰهِ التَّامَّةِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ، وَمِنْ شَرِّ عِبَادِهِ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে, তাঁর সৃষ্ট জীবদের অনিষ্ট থেকে, শয়তানদের কুমন্ত্রণা ও প্ররোচনা থেকে এবং তারা যেন আমার কাছে উপস্থিত হতে না পারে—সেই অনিষ্ট থেকেও।
حَسْبِيَ اللّٰهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
অর্থ: আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া কোনও (সত্য) ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর ভরসা করেছি। আর তিনিই মহাআরশের রব। (সূরা তাওবা, আয়াত: ১২৯)
মোটকথা, বদনজর সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে বদনজরের বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে, অন্যদিকে অমূলক ভয় বা কুসংস্কারে জড়ানো যাবে না। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে সুন্নাহসম্মত দোয়া, জিকির ও রুকইয়াহর মাধ্যমে তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করাই একজন মুমিনের করণীয়।









